
রাজা দে , থিয়েটার মগজ পত্রিকা, গোবরডাঙ্গা : মর্যাদা, শ্রদ্ধা, ইতিহাসচেতনা ও সাংস্কৃতিক আবেগে ভরপুর এক অনন্য পরিবেশে গত ৬ জুলাই গোবরডাঙ্গা পৌর টাউন হলে সংস্কার ভারতী, উত্তর ২৪ পরগনার উদ্যোগে মহাসমারোহে পালিত হলো ভারত কেশরী, প্রখ্যাত দেশনায়ক ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তী। কেবল আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই আয়োজন; বরং তাঁর জীবনাদর্শ, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবোধ এবং পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্ব রক্ষায় তাঁর ঐতিহাসিক অবদানকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার এক আন্তরিক প্রয়াসে পরিণত হয় সমগ্র অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ভারতমাতার প্রতিকৃতি এবং ভারত কেশরী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতিতে মাল্যদানের মধ্য দিয়ে। এরপর বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে দীপমন্ত্র পাঠ ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে শুভ সূচনা হয় অনুষ্ঠানের। শ্রদ্ধা, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার আবহে মুখরিত হয়ে ওঠে সমগ্র প্রেক্ষাগৃহ। উপস্থিত সকলেই গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন সেই মহান রাষ্ট্রনায়ককে, যিনি স্বাধীনতার পর জাতীয় স্বার্থ, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং বাংলার ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্নে আপসহীন ভূমিকা পালন করেছিলেন। বক্তাদের বক্তব্যে উঠে আসে দেশভাগের বিভীষিকাময় সময়ে যদি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দৃঢ় নেতৃত্ব, সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি এবং অক্লান্ত সংগ্রাম না করতেন, তবে আজকের পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিতে পারত। বাংলার মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদা রক্ষায় তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা ভারতীয় ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাই তিনি আজও বহু মানুষের হৃদয়ে 'বাংলার অতন্দ্র প্রহরী' হিসেবে সমাদৃত। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রাক্তন শিক্ষক, সমাজসেবী এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের বারাসাত সাংগঠনিক জেলার সংঘচালক সুকুমার নাথ। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. রাজেন্দ্র মজুমদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বনাথ সিনহা, প্রতিরক্ষা প্রাক্তন সেনাসদস্য কল্যাণ সমিতির সভাপতি। তাঁদের বক্তব্যে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাষ্ট্রদর্শন, দেশপ্রেম, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং পশ্চিমবঙ্গ গঠনে তাঁর অনন্য অবদানের বিভিন্ন দিক বিশদভাবে আলোচিত হয়।

সংস্কার ভারতী পরিবারের পক্ষ থেকে পরিবেশিত হয় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে স্মরণ করে এক হৃদয়স্পর্শী গীতি-আলেখ্য। সুর, আবৃত্তি ও অভিনয়ের মেলবন্ধনে সেই পরিবেশনা দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে এবং মহান দেশনায়কের জীবনাদর্শকে শিল্পের ভাষায় নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ এনে দেয়। দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঐতিহাসিক নাটক ‘অখণ্ড ভারতের অতন্দ্র প্রহরী’-র মঞ্চায়ন। নাট্যকার: সঞ্জয় আচার্য্য। ডিজাইন ও পরিচালনা: কেয়া ঘোষ ও জাহিদ সাহ। পরিবেশনা: ভাটপাড়া অরণ্যক থিয়েটার গ্রুপ এবং হালিসহর আদর্শ বিদ্যাপীঠ ড্রামা ক্লাব। নাটকটি কেবল একটি জীবনীনির্ভর প্রযোজনা নয়; এটি ছিল এক অগ্নিক্ষরা সময়ের ইতিহাস, সংগ্রাম এবং জাতীয় চেতনার শক্তিশালী নাট্যরূপ। মঞ্চের প্রতিটি দৃশ্য, সংলাপ, আলোক পরিকল্পনা এবং শিল্পীদের প্রাণবন্ত অভিনয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে দেশভাগের বিভীষিকাময় অধ্যায়। সাম্প্রদায়িক হিংসা, উদ্বাস্তু সংকট এবং বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে অসংখ্য হিন্দু পরিবারের ওপর নেমে আসা নির্যাতন, নিরাপত্তাহীনতা ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার বেদনাময় ইতিহাস নাটকের প্রতিটি মুহূর্তে গভীর আবেগের সঙ্গে ফুটে ওঠে। সেই সংকটময় সময়ে আক্রান্ত ও উদ্বাস্তু মানুষের অধিকার, সম্মান ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যে আপসহীন ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, নাটকটি তারই শিল্পসম্মত উপস্থাপনা। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা এই আদর্শকে সামনে রেখেই তিনি বাংলার স্বার্থরক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখার সংগ্রামে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা নাটকের মাধ্যমে শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হয়। দর্শকদের কাছে যেন আরও একবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে কেন ইতিহাস তাঁকে বাংলার 'অতন্দ্র প্রহরী' বলে অভিহিত করেছে। নাটকের অন্তিম দৃশ্যে প্রতিধ্বনিত হয় এক গভীর সত্য আদর্শের মৃত্যু হয় না। আত্মত্যাগ কখনও ইতিহাসের ধূলায় হারিয়ে যায় না; তা যুগে যুগে নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদা এবং জাতীয় কর্তব্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে। উপস্থিত দর্শকদের দীর্ঘ করতালি যেন সেই চিরন্তন সত্যেরই স্বীকৃতি হয়ে ধ্বনিত হয়। সমাপনী পর্বে উত্তর ২৪ পরগনা সংস্কার ভারতীর সভানেত্রী শাশ্বতী নাথ তাঁর বক্তব্যে মহান দেশনায়কের আদর্শকে সমাজ ও আগামী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। এরপর দর্পণ সংগীত একাডেমী ও পরম্পরার শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে সমবেত ‘অখণ্ড বন্দে মাতরম্’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সমগ্র প্রেক্ষাগৃহ দেশাত্মবোধের আবেগে মুখরিত হয়ে ওঠে। সেই গৌরবময় পরিবেশের মধ্য দিয়েই অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে। ইতিহাসচেতনা, দেশপ্রেম, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং শিল্পসৃষ্টির অপূর্ব সমন্বয়ে এই আয়োজন শুধু একটি জন্মজয়ন্তী পালন নয়; বরং মহান দেশনায়ক ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শকে আগামী প্রজন্মের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করার এক সার্থক সাংস্কৃতিক প্রয়াস হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
