
অনির্বাণ ঘোষ, থিয়েটার মগজ পত্রিকা : জলেবাসা, একটি গাঁয়ের নাম। গাঁয়ের নায়ক মহেন্দ্র। ব্যবসায়ী বাপের অপোগন্ড ছেলে। স্কুলে পড়ে বটে, তবে ফেলু দি গ্রেট। কিন্তু হৃদয়ে প্রেম ষোলোআনা - পাড়ার চড়াইকে একখানা প্রেমপত্র দেয়, দোষের বলতে তাতে গণ্ডাখানেক বানান ভুল। ব্যাস, হিতে বিপরীত - ভাগ্যের চড়াই-উতরাই! মহেন্দ্রর হলমার্ক ভালোবাসার চিঠি পৌঁছলো রাগী বাপের হাতে। পুরস্কার স্বরূপ বেদম উত্তম-মধ্যম! মনের দুঃখে চাঁদঢাকা বাঁশবাগানে বেসুরো গানই তার একমাত্র দুঃখবিলাস। এমন সময় দেবদূতের মতো হাজির 'গাদা'; যার বাহুল্যে বালাই নেই - আছে বলতে এক চিলতে কুঠুরি, কুঠুরিতে ঠাকুমা, সাথে কয়েকটা ছাগলছানা। সাঁঝবাগানের নিস্তব্ধতা ভেঙে জোনাকির আলোর মতো বন্ধুতা হল মহেন্দ্র-অভীক ধর, গাদা-অমিত সাহায়। ফুরফুরে জলেবাসায় রূপকথার মতো মঞ্চে হেঁটে চলে চড়াই, বিল্লি, বগা, ভ্যালাদা-রা। ঘটনার ঘনঘটায় মহেন্দ্র এসে পৌঁছয় গাদার ঘরে। গাদার ঠাম্মা, অদিতি লাহিড়ী তাকে আদরে খেতে দেয়, আর কৌতূহলী মহেন্দ্র হয়ে ওঠে প্রশ্নবিচিত্রা। মহেন্দ্রর প্রশ্নের শেষ নেই অথচ ঠাম্মা তার অজানা গল্পে একের পর এক উত্তর দিয়ে চলে। মাথামোটা মহেন্দ্র প্রথমটায় সেসব ঠাহর করতে না পারলেও ধীরে ধীরে, কালক্রমে তার বোধ তৈরি হতে শুরু করে; যেখানে গাদার সংলাপ সার্থক - 'শিখনের কোনো স্থান-কাল-পাত্র হয় নাকি!' একটা সময় পর গাদা-ঠাম্মার কুঠুরিতে মহেন্দ্রও অংশ হয়ে ওঠে। রোজনামচার মধ্যেই যাপনের গভীর পাঠ নিতে থাকে দু'জন।

এমন সব পেয়েছির আসরে দুধেচোনা সংকট আসবে না, তাই হয়? তবেই তো নাট্যিক চপেটাঘাত! ন্যায় অন্যায়ের হিসেব গুলিয়ে যায়। গাদার মায়ের মৃত্যুশোকে আত্মঘাতী হয় গাদার বাপ, কলম্বাস পাল - শুভদীপ মন্ডল। কুহক-কৌশলে মহেন্দ্রর বাবা মণিশংকর তথা দেবাশীষ দে-কে হত্যা করে গাদার ঠাকুমা। সাবলীল, হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি বারেবারেই স্মৃতির সদরে কড়া নাড়ে। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে মঞ্চে এসেছে সলমন খান ও পুলিশ অফিসার, অভিষেক দে। প্রশ্নোত্তরের তর্জায় রিলিফ তৈরি করতে ভোলেননি নাটককার। আর চমকপ্রদ জ্যান্ত বিলকিস্, এহেন মানবিক নাট্যে অমানব কুশীলবটির জুড়ি মেলা ভার। মোরগ বলে চরিত্র নয় ! আসলে ভাবনার কোনো সিলেবাস্ নেই। রবীন্দ্রনাথ যেমন প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধে পাঠভবন গড়েছেন - 'বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে'; এক্ষেত্রে বিদ্যালয় যে কেবলই শিক্ষার জাঁতাকল নয়, যেখানে শুধু প্রোডাক্ট ম্যানুফ্যাকচার হবে, এ কথাই দেবাশীষ গড়েছেন একটা ইস্কুলে। জলেবাসা নিতান্তই উত্তর ত্রিপুরার পটভূমি, তবু একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে এ গল্প বাংলার। নিত্যদিন একটার পর একটা স্কুল বন্ধ। শিক্ষক-শিক্ষিকারা মাসোহারা পান মিড-ডে-মিল সামলে। কারণে অকারণে ছুটি ঘোষণা, স্কুল-ছুট নামান্তরে চেতনার হনন দেবাশীষের ইস্কুল। জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ। পিরিতির পাঠশালায় তরঙ্গায়িত মহেন্দ্রর শিক্ষকই যেন গাদা। যে পাঠশালায় কেউ কখনো ফেল করে না। সহজ-সত্যের মেলবন্ধনে জলেবাসা হয় ভালোবাসা।

অভিনব দৃশ্যবিন্যাসে পেঁজালো তুলোর মেঘে ঢাকা আকাশ যেভাবে ভার্টিক্যালে দৃষ্টিনন্দিত, সেভাবেই অদ্রিশ রায়ের নাট্যসামগ্রীসহ হরাইজোন্টাল লৌকিক নিবেদন দর্শকের গায়ে কাঁটা দেয়, নিজের হয়ে ওঠে। মানুষ গড়ার কারিগর ঠাকুমা হয়ে ওঠে জীবন্ত বিবেক, যে প্রতিনিয়ত পরোক্ষ চাবুক মারে আজকালকার বেসরকারী ইংরেজীমাধ্যম বিদ্যালয়ের কর্পোরেট শিক্ষাব্যবস্থাকে। দোতারার সুর, সৌভিক বিশ্বাসের বাদ্য, লোকায়ত গানে জন্ম নেয় শৈশবের মিঠাস, অভীক চক্রবর্তীর আবহ প্রক্ষেপণ আর ডানা রায়ের বিভঙ্গে রচিত হয় বেঁচে থাকার পালা - 'না জেনে ভেদ বাতেন / হারাম তোমরা বলো কেন? / এ গান শুনছেন নবী ইয়াসিন।'

পরিশেষে এটুকুই বলি, 'সকলের তরে সকলে আমরা'র নতুন পাঠ্যক্রম রচনা করেছেন 'চাকদহ নাট্যজন'। প্রত্যেক অভিনেতার কন্ঠ প্রয়োগ নিপুণ, সুস্পষ্ট। সুমন পালের তত্ত্বাবধানে যেভাবে সৌমেন ভট্টাচার্য, উজান গাঙ্গুলি, অক্ষয় নারায়ণ ঝাঁ, পৌলমী ঘোষ, সন্দীপা চ্যাটার্জী ও আদৃতা পাল ঘাম ঝরিয়েছেন, তা প্রশংসার দাবী রাখে। নাটক শুরুর সময় দর্শকের উদ্দেশ্যে চলভাষ নীরব রাখার আর্জি যেমন পালের গোদা সুমন ভাষ্যে বিকল্পের সন্ধান দেয়, পাশাপাশি জঙ্গল-নদী-বাস্তবতার মুহুর্মুহু চোখ তৈরি করে এ নাট্য; স্বপ্নবুননের আকাশে আলোক-সম্পাত আনে চোখের আরাম। জীবনের পাঠ বিকিরণে মঞ্চ থেকে মন চেয়ে দৃষ্টিপাত করুক 'একটা ইস্কুল', খোঁজ চলুক অহরহ।