রাজা দে, থিয়েটার মগজ পত্রিকা, কলকাতা : দমদমের Act One Studio-তে গত ২৭ আগস্ট, বৃহস্পতিবার মঞ্চস্থ হল বাংলা নাট্য সমাজের একাদশতম প্রযোজনা ‘পুনরাবৃত্তি’। নাট্যকার পার্থসারথি ব্যানার্জীর রচনা এবং প্রসেনজিৎ তলাপাত্রের নির্দেশনায় নির্মিত এই প্রযোজনা মূলত ক্ষমতা, লোভ এবং মানুষের রাজনৈতিক চরিত্রের এক তীক্ষ্ণ অনুসন্ধান।
‘রাজা আসে, রাজা যায়—সিংহাসনটা একই থেকে যায়’—এই ভাবনাটিই নাটকের কেন্দ্রে। ক্ষমতায় আসার আগে একজন শাসকের মুখে থাকে মানুষের সেবা, পরিবর্তনের স্বপ্ন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছনোর পর সেই মানুষটির ভিতরে থাকা লোভ, সম্পদের আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতা ধরে রাখার বাসনা ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করতে শুরু করে। যে মানুষটি একদিন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সিংহাসনে বসে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সিংহাসনেরই চরিত্র হয়ে ওঠে। বদলে যায় রাজা, কিন্তু বদলায় না ক্ষমতার কাঠামো।
নাটকটির ‘পুনরাবৃত্তি’ তাই শুধু নাম নয়, একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক। ইতিহাসের পাতা ওলটালেও, শাসক বদলালেও, ক্ষমতার চরিত্র যেন একই থেকে যায়। নতুন রাজা আসে নতুন স্বপ্ন নিয়ে, কিন্তু সিংহাসনে বসার পর পূর্বসূরিরই পথ অনুসরণ করতে শুরু করে। ক্ষমতা যেন ব্যক্তিকে নিজের মতো করে গড়ে নেয়। আর সেই চক্রই বারবার ফিরে আসে।
পার্থসারথি ব্যানার্জীর লেখায় এই বক্তব্য সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণের আকারে না এসে নাট্যঘটনা ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে। ফলে দর্শকের কাছে প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ধরা দেয়—সমস্যা কি কেবল শাসকের, নাকি সেই ক্ষমতার কাঠামোর, যা প্রতিটি নতুন শাসককে একই পথে নিয়ে যায়?
পরিচালক প্রসেনজিৎ তলাপাত্র নাটকের এই রাজনৈতিক ও দার্শনিক বক্তব্যকে মঞ্চে যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছেন। নাটকের গতি, দৃশ্য বিন্যাস এবং অভিনেতাদের পারস্পরিক সমন্বয়ে একটি সুসংহত মঞ্চভাষা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতার উত্থান এবং তার সঙ্গে মানুষের মানসিক পরিবর্তনকে অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে নির্দেশনার সচেতনতা স্পষ্ট।
অভিনয়েও প্রযোজনাটি যথেষ্ট শক্তিশালী। দক্ষ ও আন্তরিক অভিনয় নাটকের বক্তব্যকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। চরিত্রগুলির দ্বন্দ্ব, লোভ, ক্ষমতার মোহ এবং পরিবর্তনের মুহূর্তগুলি অভিনেতারা যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। ফলে নাটকের রাজনৈতিক বক্তব্য কেবল সংলাপে সীমাবদ্ধ থাকেনি, চরিত্রের আচরণ এবং অভিনয়ের মধ্য দিয়েও তা প্রকাশ পেয়েছে।
‘পুনরাবৃত্তি’র সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই—নাটকটি কোনও নির্দিষ্ট রাজা বা নির্দিষ্ট সময়ের গল্প হয়ে আটকে থাকে না। বরং ক্ষমতার চরিত্র নিয়ে একটি সার্বজনীন প্রশ্ন তুলে ধরে। কে সিংহাসনে বসছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে—সিংহাসনে বসার পর সে কতটা নিজেকে ধরে রাখতে পারছে?
রাজা বদলায়, মুখ বদলায়, প্রতিশ্রুতি বদলায়; কিন্তু সিংহাসন থেকে যায়। আর সেই সিংহাসনের লোভ, সম্পদ ও ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত নতুন রাজাকেও পুরনো রাজার মতো করে তোলে। এই চক্রের মধ্যেই ‘পুনরাবৃত্তি’র মূল বক্তব্য—এবং সমকালীন সমাজ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সেই বক্তব্য যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক ও ভাবনাজাগানিয়া।
বাংলা নাট্য সমাজের একাদশতম প্রযোজনা হিসেবে ‘পুনরাবৃত্তি’ তাই শুধু একটি নাট্যপ্রদর্শন নয়; ক্ষমতার স্বরূপ নিয়ে দর্শককে অস্বস্তিকর অথচ জরুরি কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানোর একটি সফল প্রচেষ্টা।